🦚💐🏵️🌺🌷🌺🏵️💐🦚
🌳🌴শ্রীনৃসিংহ চতুর্দশী🌴🌳
🦚💐🏵️🌺🌷🌺🏵️💐🦚
শ্রী শ্রী গুরু গৌরাঙ্গ জয়তঃ
সকল সাধু, গুরু, বৈষ্ণব ও গৌর ভক্তবৃন্দের শ্রীচরণে আমার অনন্ত কোটি সাষ্টাঙ্গ দণ্ডবৎ প্রণাম I সকল ভক্তদেরকে জানাই শ্রীশ্রী নৃসিংহদেব ভগবানের শুভ আবির্ভাব ও অভিষেক মহোৎসবের কৃষ্ণপ্রীতি শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
‘’গুরু - বৈষ্ণব - ভগবান তিনিহেঁ স্মরণ
।
তিনেহেঁ স্মরণ হইতে হয় সর্ববিঘ্ন বিনাশন
।।
অনায়াসে হয় নিজ বাঞ্ছিত পূরণ ।।‘’
জয় নৃসিংহ শ্রীনৃসিংহ।
জয় জয় জয় শ্রীনৃসিংহ ॥
উগ্রং বীরং মহাবিষ্ণুং জ্বলন্তং সর্বতোমুখম্।
নৃসিংহং ভীষণং ভদ্রং মৃর্ত্যোর্মৃত্যুং নমাম্যহম্ ॥
শ্রীনৃসিংহ, জয় নৃসিংহ, জয় জয় নৃসিংহ।
প্রহ্লাদেশ জয় পদ্মামুখপদ্মভৃঙ্গ ॥
অর্থাৎ,- জয় শ্রীনৃসিংহদেব, জয় শ্রীনৃসিংহদেব, শ্রীনৃসিংহদেবের জয় হোক! জয় হোক! জয় হোক! সর্বদিক প্রজ্জ্বলনকারী উগ্র বীর, মহাবিষ্ণু, যিনি মৃত্যুরও মৃত্যুস্বরূপ সেই ভীষণ ভদ্র শ্রীনৃসিংহদেবকে প্রণাম জানাই। প্রহ্লাদের প্রভু, পদ্মা অর্থাৎ লক্ষ্মীদেবীর মুখপদ্মের প্রতি ভ্রমর রূপ শ্রীনৃসিংহদেবের জয় হোক, শ্রীনৃসিংহদেবের জয় হোক, জয় হোক।
নমস্তে নরসিংহায়
প্রহ্লাদাহ্লাদ দায়িনে।
হিরণ্যকশিপোর্বক্ষঃ শিলাটঙ্ক নখালয়ে ॥
ইতো নৃসিংহঃ পরতো নৃসিংহো,
যতো যতো যামি ততো নৃসিংহঃ।
বহির্নৃসিংহো হৃদয়ে নৃসিংহো,
নৃসিংহমাদিং শরণং প্রপদ্যে ॥
তব করকমলবরে নখমদ্ভুতশৃঙ্গং
দলিতহিরণ্যকশিপুতনুভৃঙ্গম্।
কেশব ধৃত নরহরিরূপ জয় জগদীশ হরে ॥
অর্থাৎ,- হে নৃসিংহদেব, আমি আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। আপনি প্রহ্লাদ মহারাজকে আনন্দ দান করেন এবং পাথর কাটার ধারালো টঙ্কের মতো আপনার নখের দ্বারা আপনি হিরণ্যকশিপুর বক্ষ বিদীর্ণ করেছিলেন।
শ্রীনৃসিংহদেব, আপনি এখানে রয়েছেন এবং সেখানেও রয়েছেন, যেখানেই আমি যাই, সেখানেই আমি আপনাকে দর্শন করি। আপনি আমার হৃদয়ে এবং বাইরেও রয়েছেন। তাই আমি আদি পুরুষ, পরমেশ্বর ভগবান, শ্রীনৃসিংহদেবের শরণ গ্রহণ করি। হে নৃসিংহদেব, আপনার পদ্মের ন্যায় হস্তে নখের অগ্রভাগগুলো অদ্ভুত এবং সেই হস্তে হিরণ্যকশিপুরের দেহ ভ্রমরের মতো বিদীর্ণ করেছেন। হে কেশব! আপনি নৃসিংহদেব রূপ ধারণ করেছেন, হে জগদীশ আপনার জয় হোক।
আজ নৃসিংহ চতুর্দশী অর্থাৎ ভগবান শ্রী শ্রী নৃসিংহ দেবের শুভ আবির্ভাব তিথি । নৃসিংহ অবতার ভগবান বিষ্ণুর সবচাইতে ক্রোধরূপী অবতার । পুরাণশাস্ত্র গুলোতে ভগবান বিষ্ণুর এই অবতারের বর্ণনা দেখা যায় । কশ্যপ মুনির দুই সন্তান হিরন্যক্ষ ও হিরণ্যকশিপু ছিলো অসুর। ভগবান বিষ্ণু বরাহ অবতার গ্রহণ করে হিরন্যক্ষ অসুরকে বধ করেন। এতে হিরণ্যকশিপু ভীষন ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিশোধের আশায় বহু বছর ব্রহ্মার কঠোর তপস্যা করেন। ব্রহ্মাও হিরণ্যকশিপুরের তপস্যায় সন্তুষ্ট হন। তিনি হিরণ্যকশিপুর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে তাঁকে বর দিতে চান।
হিরণ্যকশিপু বলেন- হে প্রভু, হে শ্রেষ্ঠ বরদাতা, আপনি যদি আমাকে সত্যই বর দিতে চান, আমাকে অমরত্ব প্রদান করুন। ব্রহ্মা বলিলেন আমি নিজে অমর নয় তাই অন্য কিছু বর আমর থেকে চেয়ে নাও। হিরণ্যকশিপু বলেন- হে প্রভু, এমন বর দিন যে বরে আপনার সৃষ্ট কোনো জীবের হস্তে আমার মৃত্যু ঘটবে না। আমাকে এমন বর দিন যে বরে আমার বাসস্থানের ভিতরে বা বাহিরে আমার মৃত্যু ঘটবে না; দিবসে বা রাত্রিতে, ভূমিতে বা আকাশে আমার মৃত্যু হবে না। আমাকে এমন বর দিন যে বরে শস্ত্রাঘাতে, মনুষ্য বা পশুর হাতে আমার মৃত্যু হবে না। আমাকে এমন বর দিন যে বরে কোনো জীবিত বা মৃত সত্তার হাতে আমার মৃত্যু হবে না; কোনো উপদেবতা, দৈত্য বা পাতালের মহানাগ আমাকে হত্যা করতে পারবে না;
যুদ্ধক্ষেত্রে আপনাকে কেউই হত্যা করতে পারে না; তাই আপনার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। আমাকেও বর দিন যাতে আমারও কোনো প্রতিযোগী না থাকে। এমন বর দিন যাতে সকল জীবসত্তা ও প্রভুত্বকারী দেবতার উপর আমার একাধিপত্য স্থাপিত হয় এবং আমাকে সেই পদমর্যাদার উপযুক্ত সকল গৌরব প্রদান করুন। এছাড়া আমাকে তপস্যা ও যোগসাধনার প্রাপ্তব্য সকল সিদ্ধি প্রদান করুন, যা কোনোদিনও আমাকে ত্যাগ করবে না। ব্রহ্মা তথাস্তু বলে অন্তর্ধান হন।
অপাত্রে ভাল কিছু দিলে যেমন সে তার অপব্যবহার করে, ঠিক হিরণ্যকশিপু বর পেয়ে তাই করলো। নিজেকে নিজেই ভগবান ঘোষিত করে যাগ যজ্ঞ, দেবতাদের পূজা সকল বন্ধ করে দিলো। অসুরদের তাণ্ডব বাড়লো। হিরণ্যকশিপু যখন মন্দার পর্বতে তপস্যা করছিলেন, তখন ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবগণ তাঁর প্রাসাদ আক্রমণ করেন। দেবর্ষি নারদ হিরণ্যকশিপুরের স্ত্রী কয়াদুকে রক্ষা করেন। দেবর্ষি দেবগণের নিকট কয়াদুকে ‘পাপহীনা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। নারদ কয়াদুকে নিজ আশ্রমে নিয়ে যান। সেখানে কয়াদু প্রহ্লাদ নামে একটি পুত্রসন্তানকে জন্মদেন। নারদ প্রহ্লাদকে শিক্ষিত করে তোলেন। নারদের প্রভাবে প্রহ্লাদ হয়ে ওঠেন পরম বিষ্ণুভক্ত।
প্রহ্লাদ মুখে সর্বদা হরিনাম করতো । নিজ পুত্রের মুখে পরম শত্রু বিষ্ণুর বন্দনাস্তব শুনে হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদকে দৈত্যগুরু শুক্রের আশ্রমে আসুরিক বিদ্যা শেখবার জন্য পাঠালো । কিন্তু সেখানে অসুরাজের চেষ্টা বিফল হোলো। অল্পদিনের মধ্যে প্রহ্লাদ সকল অসুরবালক দের যারা আসুরিক বিদ্যা শিখতে এসেছিলো তাদের মধ্যে বিষ্ণু ভক্তির বীজ বপন করলো। ক্রুদ্ধ হয়ে হিরন্যকশিপু প্রহ্লাদ কে মৃত্যুদণ্ড দিতে বিষাক্ত সাপের মাঝে রেখে দিলো, মত্ত হস্তীর সামনে ফেলে দিলো, বিষ মেশানো ক্ষীর খাওয়ালো, পাহাড়ের উপর থেকে ফেলে দিলো তবুও ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদের কিছুই হলো না।
হিরন্যকশিপুরের বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে বসলো , হোলিকা বর পেয়েছিলো আগুনে তার ক্ষতি হবে না। কিন্তু অসৎ কাজে লিপ্তা হবার জন্য হোলিকা পুড়ে মরল। প্রহ্লাদ অক্ষত অবস্থায় চিতা থেকে নেমে এলো। হিরণ্যকশিপু তখন প্রহ্লাদ কে জিজ্ঞেস করলো- “তুই যে হরির নাম করিস সে থাকে কোথায়?” প্রহ্লাদ বলল- “তিনি সর্বত্র, সর্ব স্থানে বিরাজিত।” হিরন্যকশিপু একটি স্তম্ভ দেখিয়ে বলল- “এখানেও কি হরি আছেন?” প্রহ্লাদ বললেন- “অবশ্যই আছেন, এমনকি ক্ষুদ্রতম যষ্টিটিতেও আছেন।
হিরণ্যকশিপু ক্রোধ সংবরণ করতে না পেরে গদার আঘাতে স্তম্ভটি ভেঙে ফেলেন। তখনই সেই ভগ্ন স্তম্ভ থেকে ভক্তবৎসল ভগবান, ঘট ঘট বাসি অন্তর্যামী, ভাবগ্রাহী জনার্দন প্রভু নারায়ণ নৃসিংহের মূর্তিতে আবির্ভূত হন। ব্রহ্মার বর যাতে বিফল না হয়, অথচ হিরণ্যকশিপুকেও হত্যা করা যায়, সেই কারণেই বিষ্ণু নরসিংহের বেশ ধারণ করেন।
হিরণ্যকশিপু দেবতা, মানব বা পশুর মত নন, তাই নৃসিংহ পরিপূর্ণ দেবতা, মানব বা পশু নন; হিরণ্যকশিপুকে দিবসে বা রাত্রিতে বধ করা যাবে না, তাই নৃসিংহ দিন ও রাত্রির সন্ধিস্থল গোধূলি সময়ে তাঁকে বধ করেন। হিরণ্যকশিপু ভূমিতে বা আকাশে কোনো শস্ত্রাঘাতে বধ্য নন, তাই নৃসিংহ তাঁকে নিজ জঙ্ঘার উপর স্থাপন করে নখরাঘাতে হত্যা করেন। হিরণ্যকশিপু নিজ গৃহ বা গৃহের বাইরে বধ্য ছিলেন না, তাই নৃসিংহ তাঁকে বধ করেন তাঁরই গৃহদ্বারে।
ভাগবত পুরাণে আরও বলা হয়েছে, হিরণ্যকশিপুকে বধ করার পর সকল দেবতাই নৃসিংহদেবের ক্রোধ নিবারণে ব্যর্থ হন। নৃসিংহকে শান্ত করতে শিব প্রথমে বীরভদ্রকে প্রেরণ করেন। বীরভদ্র ব্যর্থ হল। বিফল হন স্বয়ং শিবও। (বীরভদ্র ব্যর্থ হলে শিব স্বয়ং মনুষ্য-সিংহ-পক্ষী রূপী শরভের রূপ ধারণ করেন। এই কাহিনির শেষভাগে বলা হয়েছে, শরভ কর্তৃক বদ্ধ হয়ে বিষ্ণু শিবের ভক্তে পরিণত হন)। সকল দেবগণ তখন তাঁর পত্নী লক্ষ্মীকে ডাকেন। কিন্তু লক্ষ্মীও স্বামীর ক্রোধ নিবারণে অক্ষম হন। তখন ব্রহ্মার অনুরোধে প্রহ্লাদ এগিয়ে আসেন। ভক্ত প্রহ্লাদের স্তবগানে অবশেষে নৃসিংহদেব শান্ত হন। তারপর প্রহ্লাদ মহারাজকে দেখে খুব আনন্দ পেলেন নৃসিংহদেব। ভগবান বললেন,- “প্রহ্লাদ, বাবা, তুমি একটা কিছু বর চাও ?”
প্রহ্লাদ বললেন, “প্রভু, আমি আর কী বর চাইব ? তুমি আমাকে কৃপা করবার জন্য এসেছো, প্রভু, আমি আর কিছু চাই না… না, কিছু নিতে হবে। “তাহলে এই বর দাও, আমার বাবা তোমার শ্রীঅঙ্গে আঘাত করেছেন, আমার বাবাকে উদ্ধার কর কৃপা কর।”
ভগবান বললেন,- প্রহ্লাদ, “তোমার বাবা আমার অঙ্গ স্পর্শ করেছে । আমার যে কীর্ত্তন করে, আমার যে নাম করে, আমাকে যে একবার দর্শন করে, সে কৃপা পেয়ে চলে যাচ্ছে, আর তোমার বাবা আমাকে স্পর্শ করেছে; সে যখন রাগে লড়াই করে মারামারি করছিল সেই সময়ে আমাকে স্পর্শ করে সে আমার ধাম প্রাপ্ত হয়ে গেছে । তাহলে এটা বর নয়। বল আর কী বর চাও ? কী বর আমি তোমাকে দিতে পারি ?”
তখন প্রহ্লাদ বললেন, “আর কী চাইব ? তোমার যদি কিছু দিতেই হয় আমাকে, তখন এই বর আমি চাই,- আমি চাই যে আমার জন্য চাওয়ার বাসনাটা কেটে যায়, এই বর দাও, প্রভু ।”
এইটা হল মূল শিক্ষা । ভগবানের কাছ থেকে চাওয়ার বাসনাটা কেটে যেতে হবে । ভগবানকে নিজের ইন্দ্রিয়তর্পণ করবার জন্য আমরা সবসময় এই চাই, সেই চাই এইটা বন্ধ করতে হবে । প্রহ্লাদ মহারাজ, হিরণ্যকশিপু, নৃসিংহদেবের অর্থ হচ্ছে যে, লোকেরা নৃসিংহদেবের কাছে সবসময় বলে, আমার ছেলের চাকরি হোক, মেয়ের বিয়ে হোক, শরীর ভালো হোক, টাকা-পয়সা হোক ইত্যাদি । যে শুদ্ধ ভক্ত, সে প্রার্থনা করে, “ভগবান, আমি তোমাকে একমাত্র প্রার্থনা করি, যেন শুদ্ধ ভক্তি আর তোমার চরণে অচলা ভক্তি থাকে, তোমার চরণে যেন রতিমতি থাকে, যেন তোমার করুণায় তোমার জন্য নিরন্তর আমি সেবা করতে পারি। ভক্তির বিনাশ না হয় তুমি শুদ্ধ ভক্তির বিঘ্ন বিনাশ কর! ওই মায়ার কবলে পড়ে যেন আমার কোন ভক্তিতে বিনাশ না হয়, আমি সেই বরটা চাই, নিজের ইন্দ্রিয়তর্পণের জন্য কিছু চাই না !”
আসুন আমরা প্রার্থনা করি- হে প্রভু। আপনি সমগ্র পৃথিবীর মঙ্গল করুন । যেহেতু হিন্দুদিগের ওপর দুর্বৃত্তের আক্রমণ বেশী হয় তাই প্রভুর কাছে প্রার্থনা করি, "তোমার উপাসক সনাতন ধর্মাবলম্বীদেরকে তুমিই রক্ষা করো প্রভু।"
🌹 জয় ভক্তবৎসল শ্রীনৃসিংহদেব জয় 💐🌹💐জয় প্রহ্লাদ মহারাজের জয়💐




No comments:
Post a Comment