🦚💐🏵️🌺🌷🌺🏵️💐🦚
🌻শ্রীনিত্যানন্দ ত্রয়োদশী🌻
🦚💐🏵️🌺🌷🌺🏵️💐🦚
শ্রী শ্রী গুরু গৌরাঙ্গ জয়তঃ
সকল সাধু, গুরু, বৈষ্ণব ও গৌর ভক্তবৃন্দের শ্রীচরণে আমার অনন্ত কোটি সাষ্টাঙ্গ দণ্ডবৎ প্রণাম I হরে কৃষ্ণ, আগামী ২৫/০২/২০২১ ইং রোজ - বৃহস্পতিবার শ্রীশ্রীনিত্যানন্দ ত্রয়োদশী ব্রতের উপবাস। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর শুভ আবির্ভাব তিথি ব্যাসপূজা । সকল ভক্তদের জানাই অগ্রিম নিতাই, প্রীতি শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন
। আশা করি সকল ভক্তবৃন্দরাই এই মহাব্রত ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আদি পালন করিবেন।
(পারণ - পরদিন পূর্ব্বাহ্ন ০৯ / ৫৬ মিঃ মধ্যে ত্রয়োদশীর পারণ)
আপনি নিজে একাদশী ব্রত পালন করুন ও অন্যকে পালনে উৎসাহিত করুন।
জয় জয় শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য কৃপাসিন্ধু।
জয় জয় নিত্যানন্দ অগ্রগতির বন্ধু।।১।।
নিত্যানদে যাহার তিলেক দ্বেষ রহে।
ভক্ত হইলেও সে কৃষ্ণের প্রিয় নহে।।১৮৬।।
যদ্যপিহ নিত্যানন্দ ধরে সর্ব্ব শক্তি।
তথাপিহ কা’রেহ না দিলেন বিষ্ণুভক্তি।।২১
চৈতন্যের কৃপায় হয় নিত্যানন্দে রতি।
নিত্যানন্দে জানিলে আপদ্ নাহি কতি।।২২০।। (চৈ.ভা. আদিলীলা, নবম অধ্যায়)
প্রভু নিত্যানন্দকে দয়ার, করুণার সাগর বলা হয় । তিনি দয়াল, তিনি করুণা না করলে গৌর কৃপা প্রাপ্তি হয় না । তাই সব্রাগ্রে নিতাইচাঁদের ভজনা আবশ্যক ।
মহাপ্রভু বলেছেন যে নিত্যানন্দের নিন্দা করে তার সর্বনাশ হবে। ভগবান গৌরহরি এভাবে নিত্যানন্দের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেন।
প্রভু বলে শুনহ সকল ভক্তগণ।
নিত্যানন্দ পাদোদক করহ গ্রহন।।
করিলেই মাত্র এই পাদোদক পান।
কৃষ্ণে দৃঢ় ভক্তি হয় ইথে নাহি আন।। (চৈ.ভা. মধ্যখণ্ড ১২/৩২-৩৩)
অর্থাৎ,- শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সকল ভক্তদের শিক্ষা দিচ্ছেন নিত্যানন্দের পদজল গ্রহন করতে। বৈষ্ণব কবি বলেছেন, নিতাইপদ কমল, কোটিচন্দ্র সুশীতল, যে ছায়ার জগৎ জুড়ায়। তাই মহাপ্রভু ভক্তদের বলছেন নিত্যানন্দের পাদোদক গ্রহনে কৃষ্ণভক্তি হয়।
রাঢ়দেশে কালনা হইতে ২ ক্রোশ দক্ষিণে প্রাচীন একচাকা গ্রামে নিত্যানন্দ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাড়াই পণ্ডিত ও মাতার নাম পদ্মাবতী। তাঁর আদি নাম কুবের , এই কুবেরই নিত্যানন্দ নামে সুপরিচিত । অদ্বৈতপ্রকাশের
মতে,-
‘’তেরশত পঁচানব্বই শকে ৯ মাঘ মাসে।
শুক্ল ত্রয়োদশীতে রামের পরকাশে ॥‘’ (অদ্বৈত ৪র্থ অ” )
(মতান্তরে ১৩৯৮ শকে জন্ম হয় ।) চৈতন্য সম্প্রদায়ী বৈষ্ণবেরা বলেন, নিত্যানন্দ বলরামের অবতার । চৈতন্য -ভাগবতকার বলেন,-
‘’মাঘমাসে শুক্লপক্ষ ত্রয়োদশী শুভ দিনে ।
পদ্মাবতী গর্ভে একচাকা নামে গ্রামে ।৷
হাড়াই পণ্ডিত নামে শুদ্ধ বিপ্ররাজ ।
মূলে পিতামাতা তানে করি পিতা ব্যাজ ॥
কৃপাসিন্ধু ভক্তি দাতা প্রভু বলরাম।
অবতীর্ণ হৈলা ধরি নিত্যানন্দ নাম ॥‘’
নিত্যানন্দ শশীকলার ন্যায় বৃদ্ধি পেতে লাগলেন । নিত্যানন্দের অদ্ভুত বাল্যলীলার বিবরণ চৈতন্যভাগবতে আছে, সে অপুৰ্ব্ব খেলার আভাস এইরকম,-
‘’কোন শিশু সাজায়েন পুতনার রূপে ।
কেহ স্তন পান করে উঠি তার বুকে ॥
কোন দিন শিশু সঙ্গে নল খড়ি দিয়া ।
শকট গড়িয়া তাহা ফেলেন ভাঙ্গিয়া ॥
কোন দিন শিশু সঙ্গে তালবনে যাইয়া ।
শিশু সঙ্গে তাল খায় ধেনুকে মারিয়া ॥
কোন দিন নিত্যানন্দ সেতুবন্ধ করে।
বানরের রূপ সব শিশুগণে ধরে ॥
ভেরেণ্ডার গাছ কাটি ফেলায়েন জলে ।
শিশুগণ মেলি জয় রঘুনাথ বলে।" — ইত্যাদি। (চৈতন্য ভাগবত )
ফলকথা, নিতাই ভগবানের লীলানুরূপ খেলা খেলতেন। প্রবীণ লোকেরা এই বালকের খেলা দেখে বিস্মিত হতেন, এই বালক কার কাছে এ খেলা শিক্ষা করে ? স্বয়ং হাড়াই পণ্ডিত পর্যন্ত ভেবে বিস্মিত হতেন । আবার যখন যে খেলা খেলতেন, নিতাই তখন সেই ভাবে আবিষ্ট হয়ে যেতেন, — এমন কি, সেই আদর্শ ও তাঁতে তখন ভেদ থাকত না । যে দিন লক্ষ্মণের শক্তিশেল খেলা হয়, সেদিন ভারি বিপদ ঘটে। নিতাই ভেরেণ্ডার ডাল-রূপ শেলের আঘাতে মূর্চ্ছিত । সে মূর্চ্ছা খেলার মূর্চ্ছা নয়, ভাবের মূর্চ্ছা , যথার্থই মূর্চ্ছা । নিতাইর মূর্চ্ছা দর্শনে, কি করতে হবে বালকেরা তা ভুলে গেল। ক্রমে বালকদের ছুটাছুুটিতে কথা জানাজানি হল। প্রবীন ব্যক্তিরা আসলেন । নিতাইর মা বাপ পাগলের মতো ক্রীড়াস্থানে উপস্থিত হলেন, কতশত চেষ্টা করা গেল, কত ঔষধ প্রয়োগ করা হল, নিতাইয়ের মূর্চ্ছা আর ভাঙ্গেনা । ঘোর কান্নাকাটি পড়ে গেল ।
কোন এক ব্যক্তি তখন একটি শিশুকে ডেকে এনে অভয় দিয়ে পূৰ্ব্বাপর কথা জিজ্ঞাসা করলেন। সে বালক বলতে লাগল । বলতে বলতে নিতাইর শিক্ষা তার স্মরণ হল, সে আনন্দে বলে উঠল, এখনই নিতাইকে জীয়াব । তখন সেই শিশু হনুমান হয়ে গন্ধমাদন আনতে চলল। খেলার গন্ধমাদন আনা হল, তখন অন্য এক শিশু (পূৰ্ব্ব শিক্ষানুসারে ) বৈদ্যরূপ ধারণ করে ঔষধ এনে নিত্যানন্দের নাসারন্ধ্রে ধরল । আর বহু চেষ্টায় যে মূর্চ্ছা ভাঙ্গেনি , সামান্য খেলায় নিতাইয়ের সেই মূর্চ্ছা ভেঙ্গে গেল । নিত্যানন্দ গ্রামের নয়নস্বরূপ। গ্রামবাসীরা তাঁকে না দেখলে চতুর্দিক শূন্য দেখত । পিতামাতার কথা আর কি বলব ?
‘’তিলমাত্র নিত্যানন্দ না দেখিলে মাতা ।
যুগপ্রায় হেন বাসে ততোধিক পিতা ॥
তিলমাত্র নিত্যানন্দ পুত্রেরে ছাড়িয়া ।
কোথাও হাড়াই ওঝা না যায় চলিয়া ।।
কিবা কৃষিকার্য্যে কিবা যজমান ঘরে ।
কিবা ঘাটে কিবা বাটে যত কৰ্ম্ম করে ॥
পাছে যদি নিত্যানন্দচন্দ্র চলি যায়।
তিলার্দ্ধে শতেক বার উলটিয়া চায় I I’’ ( চৈতন্য ভাগবত )
কুবের বা নিত্যানন্দের খেলা যেমন অপরূপ, বিদ্যাশিক্ষাও তেমনই অদ্ভুত। এমন প্রতিভা কেউ কোনকালে দেখেনি, এরূপ প্রতিভা, এরূপ শক্তি মানুষের হতে পারে, লোকের জ্ঞান ছিল না। দর্শন মাত্রই সৰ্ব্বশাস্ত্র নিতাইর আয়ত্ত্ব হয়ে যেত । সুতরাং ভক্তি -রত্নাকর বলেন,-
‘’অল্প দিবসেই কৈল বিদ্যা উপার্জন ।
ব্যাকরণ আদি শাস্ত্রে হইলা বিচক্ষণ ॥‘’
নিতাইর বয়স যেমন, তা থেকেও আরও বেশী বয়স্ক বলে তাঁকে বোধ হত। বার বৎসরের বালককে ষোলবছরের মত দেখাত । সেই বয়সেই নিতাইর বিবাহের কথা উঠল । অনেকেই নিজ নিজ কন্যা নিতাইকে অর্পণ করতে ইচ্ছা করলেন। নিতাইর মাতা পদ্মাবতী আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন।
ভক্তি-রত্নাকরে লিখিত আছে,-
‘’নিতাইর বয়স হইল দ্বাদশ বৎসর ।
ষোড়শ বর্ষের প্রায় দেখিতে সুন্দর ।।
বহুজনে জানাইয়া হাড়াই পণ্ডিত ।
পুত্রের বিবাহ দিতে হইল উৎকণ্ঠিত ।।
একচক্রাবাসী যত ব্ৰাহ্মণ সজ্জন ।
বিবাহ প্রসঙ্গে হর্ষ হৈল সৰ্ব্বজন।‘’
কিন্তু এই আনন্দ অচিরেই নিরানন্দে পরিণত হল। তখন ১৪১০ শকাব্দ । অগ্রহায়ণ মাসের শেষে একটা উদাসীন, অতি তেজস্কর আকৃতি, হাড়াই পণ্ডিতের গৃহে অতিথি হলেন । এই অতিথি একচক্রার সর্বস্বধন হরণ করে নিয়ে গেলেন। বিদায়কালে অতিথি হাড়াই পণ্ডিতের কাছে নিতাইকে ভিক্ষা চাইলেন। হাড়াই অম্লানবদনে অতিথিকে পুত্র দিলেন, অতিথি বিমুখ করলেন না । পুত্রকে ভিক্ষা? যে পুত্র আবার প্রাণ থেকেও প্রিয়তর, যে পুত্রকে তিলমাত্র চক্ষুর অন্তরাল করা যায় না, তাঁকে পিতা হয়ে বিলিয়ে দিলেন। এ ধারণা বর্তমান কালের লোকেদের না হতে পারে, কিন্তু হাড়াই প্রাণাধিক পুত্রকে যথার্থই বিলালেন। তিনি এ ধৰ্ম্মশঙ্কটে যেন বিপথগামী না হন, এইজন্য ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলেন ।
‘’ধৰ্ম্মসঙ্কটে কৃষ্ণ রক্ষা কর মোরে।‘’ ( ভ- র -) পদ্মাবতীকে একথা বলা হল। যেমন পতি, তেমনই পত্নী । তিনি বললেন,-
''তোমার যে কথা প্ৰভু সেই কথা মোর।‘’
এরূপ পিতামাত না হলে নিতাইর মত পুত্র জন্মেন না । পিতামাতার হৃদয়পিণ্ড ছিন্ন -বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, আর কত সইবেন। যে মুহূর্তে নিতাই ঘরের বাহির হলেন, পদ্মাবতী ও হাড়াই সেই মুহূর্তেই যেখানে ছিলেন, সেখানেই মূর্চ্ছিত হলেন। যথা ভক্তিরত্নাকরে,-
‘’নিত্যানন্দ লইয়া ন্যাসী চলিলা তুরিতে।
মূর্চ্ছিত হইয়া হাড়াই পড়িলা ভূমিতে ॥
প্রাণহীন প্রায় ভূমে পড়ে পদ্মাবতী ।
হৈল যে দোঁহার দশা কহি কি শকতি ॥
কি নারী পুরুষ যত এ একচক্রায় ।
একথা শ্রবণমাত্র হৈল মৃতপ্রায় ॥‘’
এই যে পদ্মাবতী ও হাড়াই মূর্চ্ছিত হয়ে পড়লেন, তাঁদের পূর্ণজ্ঞান, সহজ জ্ঞান আর ফিরে এলনা। তাঁরা যতদিন ছিলেন, অর্ধ উন্মাদের মতোই ছিলেন । নিতাই তাঁদের ধ্যান ধারণা হয়েছিল, নিতাইয়ের চিন্তায় তাঁরা প্রকৃতই ডুবেছিলেন । ভাবের আবেশে তাঁরা তখন প্রতিক্ষণে নিতাইর দেখা পেতেন, নিতাইকে খাওয়াতেন, নাওয়াতেন, আদর করতেন। ভাবের আবেশে আবার কখনো কখনো বা পুত্রকে হারিয়ে হা-হুতাশ করতেন। ভাবে ভাবে এইরকম রঙ্গ হতো । বস্তুতঃ এতেই তাঁরা বেঁচে থাকতে পেরেছিলেন, তাঁদের বিরহব্যথা অনেক পরিমাণে দূরীভূত হয়েছিল। ভক্তিরত্নাকর বলেন,-
‘’কোথা নিতানন্দ বলি ধূলায় লোটায় ।
কি কহিতে কিবা কহে পাগলের প্রায় ॥
ক্ষণে কহে নিত্যানন্দ হৈল অনেকক্ষণ ।
আইস কোলে করি মোর জুড়াউক জীবন ॥
ক্ষণে কহে মোর আগে চলহ হাঁটিয়া।
পাকিয়াছে ধান্য মাঠে চল দেখি গিয়া ॥
ক্ষণে কহে চল বাপ হাটে শীঘ্ৰ যাই ।
যে ইচ্ছা তোমার তাহা কিনিব তথাই ॥‘’
ইত্যাদি।
যাই
হোক, নিত্যানন্দ আর ঘরে ফিরলেন না। তিনি যথারীতি সন্ন্যাসাশ্রম অবলম্বন করলেন। নিত্যানন্দের গুরুর নাম লক্ষ্মীপতি। নিত্যানন্দ ২০ বৎসর পর্য্যন্ত নানাতীর্থে ভ্রমণ করেন। শ্রীমহাপ্রভুর গুরু ঈশ্বরপুরী ঐ সময় বৃন্দাবনে ছিলেন, তিনি দেখলেন, এক তরুণ সন্ন্যাসী পাগলের মতো শ্রীকৃষ্ণকে অন্বেষণ করে ফিরছেন । ঈশ্বরপুরী তাঁর ভাব বুঝলেন, বুঝে বললেন,- "ঠাকুর
! এখানে কি দেখছ ? তোমার কানাই, নবদ্বীপে শচীর ঘরে জন্ম নিয়েছেন, সেখানে যাও , তিনি তোমারই অপেক্ষা করছেন।‘’ নিতাই
একথা শুনেই নবদ্বীপ অভিমুখে ধাবিত হলেন।
অদ্বৈত-প্রকাশে লিখিত আছে, নন্দন আচার্য্যের ঘরে মহাপ্রভু গিয়ে নিত্যানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন । সে মিলনদৃশ্য অতি চমৎকার ।
‘’গৌরসূর্য্যের ছটা পড়ি নিত্যানন্দ চাঁদে ।
শুদ্ধ প্রেমামৃত- জোৎস্নায় ব্যাপে অবিচ্ছেদে ॥
ভক্তদ্বারে ভাগবতের শ্লোক পঢ়াইলা ।
শুনি নিত্যানন্দ প্রেমে মূর্চ্ছিত হইলা।।
চেতন পাইয়া প্রভু করয়ে ক্রন্দন ।
কভু নাচে কভু হাসে উনমত্ত সম ।।
কভু কৃষ্ণ পাইলু বুলি ছাড়য়ে হুঙ্কার।
কভু অবিশ্ৰান্ত নেত্ৰে বহে অশ্ৰধার॥‘’ ( অদ্বৈতপ্রকাশ )
এইভাবে ১৪৩০ শকে মহাপ্রভুর সঙ্গে তাঁর সন্মিলন হয় । সাগরে যখন নদী মিলিত হয়, সে নদী যতই কেন বড় হোক না, তখন তার আর স্বতন্ত্রতা থাকে না, নিতাইরও এরপর আর স্বতন্ত্রতা রইলনা । ‘’নিমাই নিতাই দুই ভাই , একে অন্যে ভেদ নাই’’— উভয়ের কার্য, উভয়ের ব্যবহার এক, উভয়ে আর ভেদ রইল না । নিতাইর স্বতন্ত্রতা একেবারেই ছিলনা।
শ্ৰীমহাপ্ৰভু স্বয়ং সন্ন্যাসী, তাঁর প্রধান প্রধান পার্ষদগণের প্রায় অধিকাংশই সন্ন্যাসী । এতে এই ফল হল যে, লোকের গার্হস্থ্য আশ্রমের উপর বিরাগ জন্মাল । দলে দলে অনধিকারী লোক সন্ন্যাসী হতে লাগল। এ স্রোত ফিরাতে হবে। মহাপ্ৰভু দেখলেন, নিতাই ব্যতীত আর উপায় নাই। তাঁর প্রায় সমকক্ষ ব্যতীত অপরের উদাহরণে লোক মুগ্ধ হবে না। তাই প্রভু নীলাচলে নিতাইর দুটি হাত ধরে বললেন, ‘’ভাই ! জীবের উদ্ধারের জন্য তোমার অবতার । জীবের হিতের জন্য তুমি বিবাহ কর । লোকে দেখুক যে, বিবাহ করলেই যে ধৰ্ম্ম হয় না, তা নয়।‘’ যদিও এই কাজটি নিতান্ত অনভিপ্রেত, নিতাই তবু প্রভুর আজ্ঞা শিরোধাৰ্য্য করলেন। যথাসময়ে নিতাই গৌড়ে আগমন করলেন ।
অদ্বৈত প্রকাশে লিখিত আছে, নিতাইচাঁদ তাঁর কৃপাপাত্র উদ্ধারণ দত্ত সহ বেড়াতে বেড়াতে অম্বিকায় এসে উপস্থিত হলেন। তাঁর মনোমোহন রূপ যে দেখে, সেই মোহিত হতে লাগল। ঘটনাক্রমে এখানে সূৰ্য্যদাস পণ্ডিতের সঙ্গে নিত্যানন্দের সাক্ষাৎ হল। সূৰ্য্যদাস তাঁর পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে উদ্ধারণ উত্তর করেন,-
. ………………. ইঁহো ব্রাহ্মণ উত্তম ।
রাঢ়ীয়শ্রেণী সৰ্ব্বশাস্ত্রে
অতি শ্রেষ্ঠতম ।।
ন্যায়চূড়ামণি ইঁহার শাস্ত্রের আখ্যাতি।
নিত্যানন্দ নাম প্রেমানন্দপুরে স্থিতি ॥”
সূৰ্য্যদাস অতি যত্নে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। তাঁর পত্নী এই অবধূতের অসামান্য রূপদৰ্শনে বিমুগ্ধ হয়ে তাঁকে কন্যাদান করবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু সূৰ্য্যদাস লোক লজ্জায় বিশেষতঃ আত্মীয় স্বজনের অসম্মতি দেখে অজ্ঞাত- কুলশীলকে কন্যাদান করতে পারলেন না ।
নিত্যানন্দ সেখান থেকে বিদায় হয়ে উদ্ধারণের সঙ্গে গঙ্গাতীরে এসে বাস করলেন। ঘটনাক্রমে একদিন সূৰ্য্যদাস তাঁর কন্যা বসুধার মৃতদেহ নিয়ে সৎকারের উদ্দেশে গঙ্গাতীরে আসলেন। অবধূত মৃতদেহ দর্শন করে সূৰ্য্যদাসকে জানালেন,-
''এই কন্যায় যদি মুঞি জীয়াইতে পারি।
তবে মোরে কন্যা দিবা কহ সত্য করি ॥
শুনিয়া পণ্ডিত কহে আর বন্ধুগণ।
জীয়াইলে কন্যা দিব করিলাম পণ ॥
নিত্যানন্দ তাহা শুনি আনন্দিত মনে ।
মৃত-সঞ্জীবন নাম দিলা তার কাণে ।।
হরিনামামৃত পিয়া বসুধা উঠিল।
অলৌকিক কার্য্যে সভে বিস্ময় মানিলা ।।‘’ ( অদ্বৈত প্রকাশ )
সূর্য্যদাস কন্যাকে ঘরে আনলেন, শুভ দিন দেখে মহা সমারোহে আপন কন্যার সঙ্গে নিত্যানন্দের বিবাহ দিলেন ।
"বসুধা দেবীকে প্রভু বিবাহ করিলা ।
যৌতুক ছলে জাহ্নবারে আত্মসাথ কৈলা।‘’ ( অদ্বৈত প্রকাশ )
এইরূপে চির উদাসীন অবধূত গৃহী হলেন । সেখান থেকে নিতাই পত্নীসহ খড়দহে এসে বাস করতে লাগলেন । এখানে তিনি শ্যামসুন্দরের সেবা প্রকাশ করেন। বসুধার গর্ভে বীরভদ্র জন্মগ্রহণ করেন ; এঁর সন্তান থেকেই কুলীনদের বীরভদ্রী থাক ও এঁরই বংশে খড়দহের গোস্বামিগণের উৎপত্তি হয়েছে।
বাঘনাপাড়ায় নিত্যানন্দ বংশীয় যে গোস্বামিরা আছেন, তাঁরা জাহ্নবাদেবীর পোষ্য রামাই-প্রভুর সন্তান বলে গণ্য । কিন্তু জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলে রামভদ্র জাহ্নবার পুত্র বলে বর্ণিত হয়েছেন ।
‘’সূর্য্যদাস- নলিনী শ্ৰীবসু- জাহ্নবী।
পাণিগ্রহণ করিলা স্বচ্ছন্দ কৌতুকী ॥
বসু গর্ভে প্রকাশ গোসাঞি বীরভদ্র ।
জাহ্নবীনন্দন রামভদ্র মহামল্ল ॥‘’ ( চৈতন্যমঙ্গল )
নিত্যানন্দের প্রধান পাট খড়দহ । শ্ৰীনিত্যানন্দের
অপার লীলার বিস্তারিত বিবরণ অন্যত্র দেওয়ার অবকাশ রইল । নিতাইচাঁদ ১৪৫৬ শকে দেহত্যাগ করেন। বৃন্দাবনদাসের নিতানন্দ- বংশমালা গ্রন্থে তা এই রূপে বর্ণিত হয়েছে,-
‘’চৈতন্য বিচ্ছেদে প্রভুর সদাই বিলাপ ।
কদাচিৎ বাহ্য হৈলে চৈতন্য আলাপ ॥
কায়,মন,বাক্যে সদা চৈতন্য ধিয়ায় ।
উচ্চৈঃস্বর করি চৈতন্যের গুণ গায় ॥
নিরন্তর খড়দহের অভ্যন্তরে স্থিতি ।
শ্যামসুন্দরেরে কভু দেখে গৌরমূৰ্ত্তি ॥
কে বুঝিতে পারে নিত্যানন্দের প্রভাব ।
মন্দিরে প্রবেশ করি কৈলা তিরোভাব ॥‘’
নিতাইচাঁদের অসীম কৃপা প্রাপ্ত করার প্রয়াসে আসুন আগামীকাল শ্রীনিত্যানন্দ ত্রয়োদশী তিথির ব্রতোপবাস পালন করি;
🏵️জয় নিতাই🏵️জয় নিতাই🏵️জয় নিতাই🏵️জয় নিতাই🏵️




No comments:
Post a Comment